রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের পরিকল্পনাটি গোপন রাখতে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন, যাতে কুরাইশরা প্রস্তুতি নিতে না পারে এবং যুদ্ধ ও রক্তপাত এড়ানো যায়। পরিকল্পনাটি সুনিশ্চিতভাবে গোপন রাখতে তিনি নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেন:
1. পরিকল্পনার গোপনীয়তা রক্ষা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর পরিকল্পনার বিষয়ে খুব কম সংখ্যক সাহাবিকে অবহিত করেছিলেন। এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠ সাহাবিরাও পুরোপুরি জানতেন না যে তাদের গন্তব্য মক্কা। তিনি বিভিন্ন গোত্র ও উপজাতির লোকদের কাছ থেকেও এই তথ্য গোপন রেখেছিলেন।
2. সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি ও সময়সূচি গোপন রাখা:
তিনি মুসলিম বাহিনীকে দ্রুত প্রস্তুত হতে নির্দেশ দেন এবং তাদেরকে জানান যে তারা একটি অভিযানে যাবে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট গন্তব্য উল্লেখ করেননি। এইভাবে, শত্রুরা মুসলিম বাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে অবগত হতে পারেনি।
3. সম্ভাব্য তথ্য ফাঁস রোধ:
মক্কার কুরাইশদের কাছে কোনো ধরনের তথ্য ফাঁস হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এই ব্যাপারে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো হাতিব ইবনে আবি বালতাআ'র ঘটনা। হাতিব (রা.) একজন প্রখ্যাত সাহাবি ছিলেন, কিন্তু তাঁর পরিবার মক্কায় ছিল এবং তাদের নিরাপত্তার চিন্তায় তিনি কুরাইশদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যেখানে মুসলিম বাহিনীর অভিযানের তথ্য ছিল।
ঐশী বার্তা পাওয়া: আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.) এই তথ্য জানতে পারেন যে হাতিব একটি চিঠি পাঠিয়েছেন।
চিঠি উদ্ধার: তিনি হজরত আলী (রা.), মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) এবং আবু মারসাদ আল-ঘানাবি (রা.)-কে দ্রুত পাঠান, যাতে তারা রাওদাতু খাখ নামক স্থানে একটি মহিলার কাছ থেকে চিঠিটি উদ্ধার করতে পারেন।
চিঠি পাওয়া: তারা মহিলাকে চিঠি দিতে বলেন, কিন্তু তিনি অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত, সতর্ক অনুসন্ধানের পর চিঠিটি তার চুলের বিনুনির মধ্যে লুকানো অবস্থায় পাওয়া যায়।
হাতিবের ব্যাখ্যা: চিঠি ফিরে পাওয়ার পর, রাসূলুল্লাহ (সা.) হাতিবকে ডেকে পাঠান। হাতিব জানান যে তিনি কুরাইশদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি বরং নিজের পরিবারকে সুরক্ষিত করার জন্য এটি করেছিলেন। তিনি বলেন, তাঁর বিশ্বাস অটুট এবং তিনি মুসলিম।
মাফ করে দেওয়া: হজরত উমর (রা.) হাতিবকে শাস্তি দেওয়ার প্রস্তাব দেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) হাতিবকে মাফ করে দেন এবং বলেন যে তিনি বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া করেছেন।
4. দু'আ ও আল্লাহর উপর নির্ভরতা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে দু'আ করেন যাতে তাদের পরিকল্পনা গোপন থাকে এবং মক্কায় শান্তিপূর্ণভাবে প্রবেশ করতে পারেন। তাঁর নির্ভরতা ও বিশ্বাস আল্লাহর উপর ছিল যে তিনি তাদেরকে সাহায্য করবেন।
5. বাহিনীর দ্রুত অগ্রগতি:
মুসলিম বাহিনী দ্রুতগতিতে মক্কার দিকে অগ্রসর হয়, যাতে কোনো খবর আগে পৌঁছাতে না পারে। তাদের গতি ও কৌশলগত অগ্রগতির কারণে কুরাইশরা প্রস্তুতি নিতে পারেনি।
6. গোয়েন্দা কার্যক্রম ও পর্যবেক্ষণ:
রাসূলুল্লাহ (সা.) শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য গোয়েন্দা নিয়োগ করেছিলেন এবং সম্ভাব্য তথ্য ফাঁস রোধে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
7. বিভিন্ন দিক থেকে প্রবেশ:
মক্কার চারপাশ থেকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে মুসলিম বাহিনী শহরে প্রবেশ করে। এটি শত্রুদের বিভ্রান্ত করে এবং প্রতিরোধের সম্ভাবনা কমায়।
ফলাফল: এই সমস্ত পদক্ষেপের ফলে মক্কা বিজয় প্রায় রক্তপাতহীনভাবে সম্পন্ন হয়। কুরাইশরা কোনো বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কায় প্রবেশ করে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। এই ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যেখানে কৌশলগত পরিকল্পনা ও গোপনীয়তা রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।